রাজনীতির চোরাবালি: আদর্শের বিসর্জন ও এক ‘অরসেলাইন’নির্বাচনের আখ্যান।

দিনপত্র ডেস্ক ::বাংলার আকাশে এখন রাজনীতির যে মেঘ জমেছে, তা বৃষ্টি ঝরাতে নয়, বরং এক ভয়াবহ ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যে দেশের মাটিতে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত মিশে আছে, সেখানে আজ রাজনীতির মেরুকরণ দেখে মনে হয়—ইতিহাস বুঝি বড় বেশি নিষ্ঠুর কৌতুক করতে ভালোবাসে। আজ যে দৃশ্যপট আমরা দেখছি, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘ দুই দশকের সুনিপুণ এক মরণফাঁদ, যার সুতো রয়েছে পর্দার অন্তরালে থাকা কিছু কুশলী কারিগরের হাতে।

সবচেয়ে বড় বিস্ময় জাগে যখন দেখি, জামায়াতের পতাকাতলে ‘সাহাবী’ কৃষ্ণ নন্দীরা সমবেত হন। প্রশ্ন জাগে মনে—যিনি যজ্ঞের আগুন আর বেদের শ্লোক নিয়ে বড় হয়েছেন, তিনি যখন ‘কোরআনের শাসন’ কায়েমের স্বপ্নে দাড়িপাল্লা মার্কায় ভোট চান, তখন সেই আদর্শের ভিত্তি আসলে কী? এটি কি কোনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নতুন উদাহরণ, নাকি নিছকই ক্ষমতার লোভে করা এক অদ্ভুত সার্কাস? একসময় যারা আওয়ামী লীগকে ভারতের দালাল বলে গালি দিত, আজ তারাই যখন পূজা আর রোজাকে এক পাল্লায় মাপেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে এদের কাছে ধর্ম কেবলই রাজনৈতিক ঢাল। এই সুবিধাবাদী রাজনীতির পেছনে কোন আন্তর্জাতিক শক্তির ইশারা কাজ করছে, তা ভাববার সময় এসেছে।

ছোট ভাই তাহমীম ঠিকই বলেছে, ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়; বরং এটি একটি ‘অরসেলাইন নির্বাচন’। যে নির্বাচনের ফলাফল মাসখানেক আগেই কোনো এক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নির্ধারিত হয়ে আছে, সেখানে সাধারণ মানুষের ভোটের মূল্য কতটুকু? রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ যে সুপ্ত জামায়াতিদের আস্ফালন, তা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই অন্ধকার সময়ের ফসল। সেদিন ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত যে বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল, আজ তার ফল ভোগ করছে বাংলাদেশ।

দুর্ভাগ্য এই যে, বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি-আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-একই সমতলে দাঁড়িয়ে এই ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৫ বছরের ক্ষমতার ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে বিএনপি আজ এতটাই বিভোর যে, তারা বুঝতে পারছে না তাদের পায়ের তলার মাটি কখন জামায়াত কেড়ে নিয়েছে। ২০০১ সালে যেভাবে র‍্যাব এবং ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আড়ালে ছাত্রদলের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, ইতিহাস আজ আবার সেই একই পথে হাঁটছে। বিএনপি যখন ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার স্বপ্নে বিভোর ছিল, জামায়াত তখন সুকৌশলে রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করেছে। আজ বিএনপি সেই পেটখারাপের যন্ত্রণায় ভুগছে, যার উপশম তাদের জানা নেই।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ আজ এক মহাসংকটে। নৌকা প্রতীকহীন, নেতৃত্বহীন এক নির্বাচনের পথে তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তবে কি এই নির্বাচন বর্জনই হবে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ? যে নির্বাচনে ভোটারদের ভোটাধিকারের বদলে পোস্টাল ভোটের জালিয়াতি আর ভৌগোলিক ভোটার স্থানান্তরের পরিকল্পনা মুখ্য, সেই নির্বাচনে অংশ নেওয়া মানে তো আত্মহত্যার শামিল। তুরস্কের জালিয়াতির মডেল আজ বাংলাদেশে প্রয়োগের যে নীল নকশা পাকিস্তান ও তুরস্কের সহায়তায় বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে, তাতে ১২ ফেব্রুয়ারির ফলাফল নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।

জামায়াত এখন ‘মরণ কামড়’ দেওয়ার অপেক্ষায়। তারা ইসরায়েলি মোসাদ থেকে শুরু করে সবার সঙ্গেই হাত মেলাতে প্রস্তুত, যদি বিনিময়ে রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়া যায়। তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট-মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশকে এক জঙ্গিবাদী উগ্রপন্থার চারণভূমিতে পরিণত করা।

সময় এসেছে সাধারণ মানুষের জেগে ওঠার। এই ‘অরসেলাইন’ নির্বাচনের কারসাজি আর রাজনীতির এই পচনশীল রূপ দেখেও যদি আমরা নিশ্চুপ থাকি, তবে আগামীর ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। নৌকার ভোটারদের জন্য বর্জনই হোক নীরব কিন্তু প্রচণ্ড এক প্রতিবাদ। কারণ, যেখানে গণতন্ত্র নেই, যেখানে ভোট কেবল এক সাজানো নাটক, সেখানে অংশগ্রহণ মানেই সেই মিথ্যাকে বৈধতা দেওয়া।

বাঙালিকে মনে রাখতে হবে, শকুনরা যখন আকাশে ওড়ে, তখন তারা নিচে কোনো মৃতদেহেরই অপেক্ষা করে। আজ বাংলাদেশের গণতন্ত্র নামক সেই মৃতদেহটির ওপর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের ভোজ শুরু হতে যাচ্ছে। এই ভোজ রুখে দেওয়ার শক্তি কি আমাদের আছে?
যদি না থাকে তবে বর্জনই হোক আমাদের প্রতিবাদ।

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চীরজীবি হউক।

Tag :

কমেন্ট করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

Glorifying War Criminals in an Illegal Parliament During the Month of Independence: A Shameful Chapter in History and an Ultimate Act of National Betrayal

রাজনীতির চোরাবালি: আদর্শের বিসর্জন ও এক ‘অরসেলাইন’নির্বাচনের আখ্যান।

Update Time : 12:49:55 pm, Thursday, 22 January 2026

দিনপত্র ডেস্ক ::বাংলার আকাশে এখন রাজনীতির যে মেঘ জমেছে, তা বৃষ্টি ঝরাতে নয়, বরং এক ভয়াবহ ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যে দেশের মাটিতে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত মিশে আছে, সেখানে আজ রাজনীতির মেরুকরণ দেখে মনে হয়—ইতিহাস বুঝি বড় বেশি নিষ্ঠুর কৌতুক করতে ভালোবাসে। আজ যে দৃশ্যপট আমরা দেখছি, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘ দুই দশকের সুনিপুণ এক মরণফাঁদ, যার সুতো রয়েছে পর্দার অন্তরালে থাকা কিছু কুশলী কারিগরের হাতে।

সবচেয়ে বড় বিস্ময় জাগে যখন দেখি, জামায়াতের পতাকাতলে ‘সাহাবী’ কৃষ্ণ নন্দীরা সমবেত হন। প্রশ্ন জাগে মনে—যিনি যজ্ঞের আগুন আর বেদের শ্লোক নিয়ে বড় হয়েছেন, তিনি যখন ‘কোরআনের শাসন’ কায়েমের স্বপ্নে দাড়িপাল্লা মার্কায় ভোট চান, তখন সেই আদর্শের ভিত্তি আসলে কী? এটি কি কোনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নতুন উদাহরণ, নাকি নিছকই ক্ষমতার লোভে করা এক অদ্ভুত সার্কাস? একসময় যারা আওয়ামী লীগকে ভারতের দালাল বলে গালি দিত, আজ তারাই যখন পূজা আর রোজাকে এক পাল্লায় মাপেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে এদের কাছে ধর্ম কেবলই রাজনৈতিক ঢাল। এই সুবিধাবাদী রাজনীতির পেছনে কোন আন্তর্জাতিক শক্তির ইশারা কাজ করছে, তা ভাববার সময় এসেছে।

ছোট ভাই তাহমীম ঠিকই বলেছে, ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়; বরং এটি একটি ‘অরসেলাইন নির্বাচন’। যে নির্বাচনের ফলাফল মাসখানেক আগেই কোনো এক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নির্ধারিত হয়ে আছে, সেখানে সাধারণ মানুষের ভোটের মূল্য কতটুকু? রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ যে সুপ্ত জামায়াতিদের আস্ফালন, তা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই অন্ধকার সময়ের ফসল। সেদিন ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত যে বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল, আজ তার ফল ভোগ করছে বাংলাদেশ।

দুর্ভাগ্য এই যে, বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি-আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-একই সমতলে দাঁড়িয়ে এই ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৫ বছরের ক্ষমতার ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে বিএনপি আজ এতটাই বিভোর যে, তারা বুঝতে পারছে না তাদের পায়ের তলার মাটি কখন জামায়াত কেড়ে নিয়েছে। ২০০১ সালে যেভাবে র‍্যাব এবং ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আড়ালে ছাত্রদলের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, ইতিহাস আজ আবার সেই একই পথে হাঁটছে। বিএনপি যখন ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার স্বপ্নে বিভোর ছিল, জামায়াত তখন সুকৌশলে রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করেছে। আজ বিএনপি সেই পেটখারাপের যন্ত্রণায় ভুগছে, যার উপশম তাদের জানা নেই।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ আজ এক মহাসংকটে। নৌকা প্রতীকহীন, নেতৃত্বহীন এক নির্বাচনের পথে তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তবে কি এই নির্বাচন বর্জনই হবে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ? যে নির্বাচনে ভোটারদের ভোটাধিকারের বদলে পোস্টাল ভোটের জালিয়াতি আর ভৌগোলিক ভোটার স্থানান্তরের পরিকল্পনা মুখ্য, সেই নির্বাচনে অংশ নেওয়া মানে তো আত্মহত্যার শামিল। তুরস্কের জালিয়াতির মডেল আজ বাংলাদেশে প্রয়োগের যে নীল নকশা পাকিস্তান ও তুরস্কের সহায়তায় বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে, তাতে ১২ ফেব্রুয়ারির ফলাফল নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।

জামায়াত এখন ‘মরণ কামড়’ দেওয়ার অপেক্ষায়। তারা ইসরায়েলি মোসাদ থেকে শুরু করে সবার সঙ্গেই হাত মেলাতে প্রস্তুত, যদি বিনিময়ে রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়া যায়। তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট-মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশকে এক জঙ্গিবাদী উগ্রপন্থার চারণভূমিতে পরিণত করা।

সময় এসেছে সাধারণ মানুষের জেগে ওঠার। এই ‘অরসেলাইন’ নির্বাচনের কারসাজি আর রাজনীতির এই পচনশীল রূপ দেখেও যদি আমরা নিশ্চুপ থাকি, তবে আগামীর ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। নৌকার ভোটারদের জন্য বর্জনই হোক নীরব কিন্তু প্রচণ্ড এক প্রতিবাদ। কারণ, যেখানে গণতন্ত্র নেই, যেখানে ভোট কেবল এক সাজানো নাটক, সেখানে অংশগ্রহণ মানেই সেই মিথ্যাকে বৈধতা দেওয়া।

বাঙালিকে মনে রাখতে হবে, শকুনরা যখন আকাশে ওড়ে, তখন তারা নিচে কোনো মৃতদেহেরই অপেক্ষা করে। আজ বাংলাদেশের গণতন্ত্র নামক সেই মৃতদেহটির ওপর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের ভোজ শুরু হতে যাচ্ছে। এই ভোজ রুখে দেওয়ার শক্তি কি আমাদের আছে?
যদি না থাকে তবে বর্জনই হোক আমাদের প্রতিবাদ।

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চীরজীবি হউক।