নিউজ ডেস্ক :: দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যেন আবারও পরাশক্তির কূটনৈতিক দাবার বোর্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের এক মন্ত্রীর হঠাৎ ঢাকা সফর এবং তার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে এক নতুন সামরিক-অর্থনৈতিক অক্ষের দিকে, যার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ।
সূত্রমতে, মিয়ানমার সীমান্তে চলমান যুদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা এবং বঙ্গোপসাগর ঘিরে শক্তির প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহের আঞ্চলিক ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এই পরিকল্পনার পেছনে আছে জটিল কূটনৈতিক উদ্দেশ্য ভারত ও চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন-তুর্কি স্বার্থকে সুদৃঢ় করা।
তুরস্ক বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় তার প্রতিরক্ষা শিল্পের বাজার সম্প্রসারণে ব্যস্ত। ড্রোন, সাঁজোয়া যান ও উন্নত অস্ত্র প্রযুক্তিতে দেশটি ইতিমধ্যে নিজেকে বড় রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এই অবস্থান থেকেই তারা বাংলাদেশকে “নির্ভরযোগ্য ক্রেতা ও প্রস্তুতকারক অংশীদার” হিসেবে দেখছে। সেই উদ্দেশ্যে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সম্প্রতি ঢাকায় গোপন বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এই আলোচনায় অংশ নিয়েছেন ড. ইউনুসের গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা, যারা শিল্প-অর্থনৈতিক কাঠামো ও উৎপাদন ব্যবস্থার প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় করেছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও একই সঙ্গে সক্রিয়। তারা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য ভেঙে বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে নিজেদের ঘনিষ্ঠ পরিসরে রাখতে আগ্রহী। সাম্প্রতিক মার্কিন সফর, প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং তথাকথিত “সহযোগিতা চুক্তি” সবই এক জটিল নকশার অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, “নন-অ্যালাইন্ড” নীতির মুখোশের আড়ালে বাংলাদেশকে সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করার প্রচেষ্টা এখন প্রকাশ্য গতি পাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে—মিয়ানমার সীমান্তের অস্থিরতা ও রোহিঙ্গা ইস্যুকে পুঁজি করে পার্বত্য অঞ্চলে নতুন অস্ত্র সরবরাহের পথ তৈরি হচ্ছে। এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ তুরস্ক বা তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানের তৈরি বলে গুজব রয়েছে। এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে “গ্রামীণ সংযুক্ত” প্রকল্পগুলো যেভাবে বিদেশি তহবিলের ওপর নির্ভরশীল, তাতে আশঙ্কা বাড়ছে যে, অস্ত্রশিল্প সংক্রান্ত আলোচনাও হয়তো একই নেটওয়ার্কের অংশ। এটি কেবল শিল্পোন্নয়নের নাম নয় বরং অর্থনৈতিক প্রভাবের আড়ালে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের একটি নতুন কৌশল বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের জনগণ শান্তি, উন্নয়ন ও স্বাধীন নীতির পক্ষে। কিন্তু পরাশক্তির এই নতুন সামরিক আগ্রহ সেই স্বাধীন নীতিকে বিপদের মুখে ফেলছে। এখন সময় এসেছে স্পষ্ট অবস্থান জানানোর বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির পরীক্ষাগার নয়, কোনো অস্ত্র ব্যবসার ঘাঁটিও নয়। জাতীয় স্বার্থ ও সংবিধান রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজন পূর্ণ স্বচ্ছতা, সংসদীয় পর্যালোচনা ও গণআলোচনার।
কারণ স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তার নীতি ও নৈতিকতার ওপর অস্ত্র নয়, উন্নয়নই হোক কূটনীতির ভিত্তি।
সৌরভ দৈব 









