নিউজ ডেস্ক :: দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ভূ-রাজনীতি আজ দ্রুত পরিবর্তনের পথে, যেখানে বাংলাদেশের ভূ-অবস্থান কেবল ভৌগোলিক নয়, কৌশলগত অর্থেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত মহাসাগর থেকে হিমালয় পর্যন্ত বিস্তৃত নিরাপত্তা-সমীকরণের মাঝখানে বাংলাদেশের অবস্থান আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টি ও কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, কূটনৈতিক মহল এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করছে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ ও নীতিগত পরিবর্তনগুলোকে কেন্দ্র করে বহিঃশক্তির সক্রিয়তা পূর্বের তুলনায় আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
অভিযোগ রয়েছে—ইউনুস সরকারের সময়ে গৃহীত কিছু নীতি দেশের ঐতিহ্যগত নন-অ্যালাইন্ড ও সমতাভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিকে দুর্বল করে তুলেছে। এর ফলে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরা এটিকে এমন একটি শূন্যতা হিসেবে বিবেচনা করছেন, যা তৃতীয় শক্তির কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে চীন ও পাকিস্তানের সম্ভাব্য কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা দাবি করছেন যে, চীন তার সামরিক ও অর্থনৈতিক কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে একটি সামরিক-লজিস্টিক ঘাঁটি সদৃশ সুবিধা পেতে আগ্রহী। একই সময়ে পাকিস্তানপন্থী উপাদানগুলোর মাধ্যমে কথিতভাবে ১৪টি সামরিক বা গোয়েন্দা তদারকি পয়েন্ট সক্রিয় থাকার অভিযোগও উত্থাপিত হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, এসব তৎপরতার উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি ভারতবিরোধী প্রভাব-বলয় গঠন করা—যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক মহলের উদ্বেগ আরও তীব্রতর হয়েছে। কারণ বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে নন-অ্যালাইন্ড পররাষ্ট্রনীতি, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করেছে। কিন্তু বহিঃশক্তি-নির্ভর রাজনৈতিক পরিবেশ বা অস্থির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কোনো দেশের সার্বভৌমত্বকেই দুর্বল করে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা বহু বিশ্লেষক প্রকাশ করছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব গভীর হলে কিংবা প্রশাসনিকভাবে অস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ তৈরি হলে বহিঃশক্তির জন্য প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হয়—এটিও একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা।
একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, দায়িত্বশীল এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌম স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য। দেশের ভূখণ্ড যেন কোনো তৃতীয় শক্তির নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা বা প্রভাব-সংঘর্ষের প্ল্যাটফর্মে পরিণত না হয়—এটাই হতে হবে নীতি নির্ধারকদের প্রধান অঙ্গীকার।
দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আঞ্চলিক সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্মান এবং অ-হস্তক্ষেপের নীতির ওপর। সেই বিবেচনায়, বাংলাদেশ যদি তার ভূ-অবস্থানকে শান্তি, আস্থা ও আঞ্চলিক সংহতির স্বার্থে পরিচালনা করতে পারে—তাহলে অঞ্চলটি প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনা নয়, বরং সহযোগিতা ও সমন্বয়ের নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারবে।
Reporter Name 








