নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে সেনাবাহিনী কখনোই কেবল সীমান্ত পাহারার একটি বাহিনী ছিল না। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সেনাবাহিনীর ভূমিকা যেমন আলোচিত হয়েছে, তেমনি বিতর্কের জন্মও দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামল (১৯৯৬–২০০১ এবং ২০০৯–২০২৪) সেনাবাহিনীর জন্য এক ভিন্ন দর্শনের সূচনা করে—যেখানে ব্যারাকের গণ্ডি পেরিয়ে বাহিনীকে উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করা হয়।
ব্যারাক থেকে রাষ্ট্রকাঠামো: ভূমিকার পুনর্নির্ধারণ
শেখ হাসিনার কৌশলের মূল দর্শন ছিল—সেনাবাহিনী যেন ক্ষমতার রাজনীতির হাতিয়ার না হয়ে রাষ্ট্রের ভিত শক্ত করার একটি পেশাদার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। সেই লক্ষ্যেই একদিকে বাহিনীকে আধুনিক ও যুদ্ধ-প্রস্তুত রাখা হয়, অন্যদিকে উন্নয়ন ও মানবিক সংকটে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা হয়।
*আধুনিকায়ন,ভবিষ্যৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি*
“Forces Goal 2030” বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে নতুন গতি আসে। আধুনিক ট্যাংক, আর্টিলারি, সাঁজোয়া যান, উন্নত যোগাযোগ ও নজরদারি প্রযুক্তি বাহিনীতে যুক্ত হয়।
একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ভবিষ্যতের হাইব্রিড ও প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
*কল্যাণ ও পেশাদারিত্ব, মনোবলের ভিত*
এই সময় সেনাসদস্যদের জীবনমান উন্নয়নকে কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া হয়। বেতন কাঠামো পুনর্গঠন, ভাতা বৃদ্ধি, আধুনিক আবাসন ও চিকিৎসা সুবিধা বাহিনীর পেশাদার মনোবলকে দৃঢ় করে।
অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের পেনশন ও কল্যাণ ব্যবস্থার উন্নয়ন বাহিনীতে নিরাপত্তাবোধ ও আনুগত্য আরও শক্তিশালী করে।
উন্নয়ন ও দুর্যোগে সেনাবাহিনী
শেখ হাসিনার আমলে সেনাবাহিনী কেবল নিরাপত্তা রক্ষায় নয়, জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পের অংশীদার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বড় সড়ক, সেতু, বিমানবন্দর ও অবকাঠামো প্রকল্পে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ও লজিস্টিক সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় উন্নয়নকে গতি দেয়।
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস কিংবা কোভিড-১৯ মহামারির মতো দুর্যোগে সেনাবাহিনীর দ্রুততা, শৃঙ্খলা ও ত্যাগ সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়। এই কৌশলে সেনাবাহিনী হয়ে ওঠে মানবিক নিরাপত্তার এক নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান এই সময় আরও সুদৃঢ় হয়। সরকারি কূটনৈতিক সমর্থন ও প্রশিক্ষণের ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি পেশাদার ও দায়িত্বশীল বাহিনী হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
*আজকের বাস্তবতা, মর্যাদার ওপর আঘাত*
এমন এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজ সেনাবাহিনীকে নিয়ে প্রকাশ্য অবমাননা, কুরুচিপূর্ণ স্লোগান ও হুমকি সাধারণ মানুষকে ব্যথিত করছে। সেনাবাহিনীর প্রধানকে লক্ষ্য করে রাস্তায় গালিগালাজ, ক্যান্টনমেন্ট উড়িয়ে দেওয়ার মতো উসকানিমূলক বক্তব্য, সামাজিক মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা—এসবই একটি মর্যাদাশীল বাহিনীর ভাবমূর্তিকে আঘাত করছে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো—এই অপপ্রচারের সঙ্গে জঙ্গিবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত শক্তির উত্তরসূরিরা আজ প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীকে অবমাননা করছে—এটি স্বাধীনতাকামী জনগণ সহজভাবে গ্রহণ করছে না।
জনমতের ভাষা
বাংলাদেশের সেনাবাহিনী স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও শৃঙ্খলার প্রতীক। এই বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণ দেখতে চায়—রাষ্ট্র তার মর্যাদার প্রতীকগুলোকে সুরক্ষা দেবে, ইতিহাস ও আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন হতে দেবে না।
শেখ হাসিনার শাসনামলে সেনাবাহিনী আর শুধু ব্যারাকে সীমাবদ্ধ কোনো বাহিনী ছিল না—বরং উন্নয়ন, দুর্যোগ ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়েছিল। আজ সেই বাহিনীর মর্যাদার ওপর আঘাত মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানকে নয়, রাষ্ট্রের ভিতকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সেনাবাহিনীর সম্মান ও স্বাধীনতার ইতিহাস—এটি কোনো বিভাজনের বিষয় হতে পারে না। এই সত্যটাই আজ সাধারণ মানুষের অনুভূতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সুরজিত, 









