নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য তুরস্ক-নির্মিত Cirit সেমি-অ্যাক্টিভ লেজার গাইডেড অস্ত্র ব্যবস্থা কেনার সিদ্ধান্তটি আপাতদৃষ্টিতে আধুনিকায়নের অংশ বলে উপস্থাপন করা হলেও, বাস্তবে এটি একটি ভূরাজনৈতিক সিগন্যালিং অপারেশন—যার লক্ষ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নয়, বরং আঞ্চলিক বার্তা প্রেরণ।
প্রথমেই প্রশ্ন আসে হুমকি মূল্যায়ন নিয়ে। যদি সরকারিভাবে বলা হয় যে এই অস্ত্র কেনা হচ্ছে আরাকান আর্মি বা সীমান্তসংলগ্ন অনিয়মিত সশস্ত্র গোষ্ঠী মোকাবিলার জন্য, তাহলে সেই ব্যাখ্যা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নন-স্টেট অ্যাক্টরের বিরুদ্ধে লেজার-গাইডেড মাল্টি-পারপাস ওয়ারহেড ব্যবহারের কোনো সামরিক যুক্তি নেই। এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় ড্রোন-ভিত্তিক ISR, হালকা স্ট্রাইক প্ল্যাটফর্ম এবং সীমিত CAS সক্ষমতাই কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত। ফলে ঘোষিত হুমকি ও নির্বাচিত অস্ত্র ব্যবস্থার মধ্যে সুস্পষ্ট অসামঞ্জস্য দেখা যায়।
এই অসামঞ্জস্যই ইঙ্গিত দেয়—অঘোষিতভাবে লক্ষ্য ভিন্ন। আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে বারবার যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হলো ভারতকে একটি প্রতীকী থ্রেট সিগন্যাল দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কয়েক ডজন লেজার-গাইডেড রকেট দিয়ে কোনোভাবেই আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলানো যায় না। আধুনিক আকাশযুদ্ধে সক্ষমতা নির্ধারিত হয় নেটওয়ার্কড সেন্সর, যৌথ কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল, ইন্টিগ্রেটেড এয়ার ডিফেন্স, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং টেকসই লজিস্টিক কাঠামোর মাধ্যমে—যেখানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এখনও গুরুতর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ।
এই পর্যায়ে তুরস্কের ভূমিকা কাকতাল নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক তার প্রতিরক্ষা শিল্পকে সরাসরি রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, বিশেষত মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর ক্ষেত্রে। এই কৌশলে পাকিস্তান তুরস্কের প্রাকৃতিক অংশীদার। পাকিস্তান–তুরস্ক সামরিক সহযোগিতা মূলত একটি সুপরিচিত ভারতবিরোধী আঞ্চলিক কৌশলের অংশ, যেখানে প্রতীকী অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে চাপের পরিবেশ তৈরি করাই মুখ্য লক্ষ্য।
বাংলাদেশে Cirit অস্ত্র বিক্রি সেই বৃহত্তর ছকেরই প্রতিফলন—যেখানে বাস্তব সামরিক সক্ষমতার চেয়ে alignment ও signalling বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে ঘিরে একটি কৃত্রিম থ্রেট ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চায়, আর তুরস্ক সেই ন্যারেটিভে প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্ম সরবরাহকারীর ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান ইউনুস সরকারের অধীনে এই ক্রয় সিদ্ধান্ত সেই পাকিস্তানি প্রেসক্রিপশনের সঙ্গে আশঙ্কাজনকভাবে সাযুজ্যপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি এখানেই। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা চাহিদার চেয়ে অন্যের ভূরাজনৈতিক এজেন্ডাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা যখন বাস্তব হুমকি বিশ্লেষণের বদলে কূটনৈতিক বার্তা পাঠানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা নিরাপত্তা বাড়ায় না—বরং কৌশলগত অস্থিরতা, ভুল হিসাব এবং অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা তৈরি করে।
অস্ত্র কেনা সহজ। কিন্তু পাকিস্তান–তুরস্কের ছকে পড়ে ভুল উদ্দেশ্যে কেনা অস্ত্র রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে না—রাষ্ট্রকে ঝুঁকির দিকেই ঠেলে দেয়।
শিরোনাম :
পাকিস্তান–তুরস্কের ছকে ভারতকে থ্রেট দিতেই লেজার অস্ত্র কিনছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী
-
সুরজিত দাস - Update Time : 09:39:32 am, Wednesday, 31 December 2025
- 113 Time View
Tag :
জনপ্রিয়










