ইউনুস সরকারের অধীনে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের সংকট,উন্নয়ন থেকে অনিশ্চয়তার পথে বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক :: রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার কাঠামো নয় রাষ্ট্র মূলত নাগরিকের নিরাপত্তা, আস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নিশ্চয়তা। বিগত প্রায় দেড় দশক বাংলাদেশে এই নিশ্চয়তাগুলো—সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটি কার্যকর কাঠামোর মধ্যে ছিল। সাধারণ মানুষের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু তখন রাজনীতি নয়, বরং জীবনযাপন।
মানুষ ব্যস্ত ছিল আয়–রোজগারে, ব্যবসা–বাণিজ্য সম্প্রসারণে, সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার পরিকল্পনায়। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া, পরিবার নিয়ে ভ্রমণ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এসব ছিল স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত বাস্তবতা। সামাজিক জীবনে অস্থিরতা ও অনিরাপত্তার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম ছিল, যা রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক সাফল্যের সূচক।
এই সময়কালে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যান ছিল না, ছিল দৃশ্যমান বাস্তবতা। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিল্পায়ন—দেশের ভেতরেই “সম্ভব”-এর ধারণা তৈরি হয়েছিল। তরুণ সমাজ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, নতুন ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছিল। রাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্ক ভালো না খারাপ—এটি সাধারণ মানুষের নিত্য আলোচনার বিষয় ছিল না, কারণ অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ছিল তুলনামূলকভাবে কার্যকর ও স্থিতিশীল।
এই স্থিতিশীলতার কেন্দ্রে ছিল নেতৃত্বের সক্ষমতা। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি—এসব নিয়ে বড় ধরনের জাতীয় অনিশ্চয়তা তখন দেখা যায়নি। বরং নেতৃত্বের দক্ষতা নিয়ে এক ধরনের গর্ববোধ সমাজে বিদ্যমান ছিল।
কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে। বর্তমান ইউনুস সরকারের অধীনে রাষ্ট্র পরিচালনার যে চিত্র সামনে এসেছে, তা মূলত একটি শাসনশূন্যতার রাজনীতি। এখানে সংকট তৈরি হয়েছে কোনো একটি খাতে নয় বরং প্রায় সব মৌলিক স্তম্ভে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মানুষ আজ ছিনতাই, ডাকাতি, মব সন্ত্রাস, উগ্রবাদী তৎপরতা এবং চরমপন্থার ভয়ে বসবাস করছে। রাষ্ট্র যে নাগরিককে নিরাপত্তা দেবে এই মৌলিক সামাজিক চুক্তি কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয় এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সংকট।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি শোচনীয়। ব্যবসা–বাণিজ্য স্থবির, বিনিয়োগ কমছে, কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে। কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে, তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। উন্নয়ন কার্যক্রম কার্যত থমকে গেছে, অথচ বিকল্প কোনো সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক রূপরেখা দৃশ্যমান নয়। এই অবস্থাকে কেবল বৈশ্বিক চাপ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না এটি মূলত নীতিগত অদক্ষতার ফল।
সবচেয়ে গভীর সংকটটি তৈরি হয়েছে আদর্শিক ক্ষেত্রে। স্বাধীনতাবিরোধী ও উগ্রবাদী শক্তির পুনরুত্থান এখন আর প্রান্তিক নয় তারা ক্রমশ প্রকাশ্য ও সাহসী হচ্ছে। সামাজিক সহনশীলতা ক্ষয়ে যাচ্ছে, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার ওপর আঘাত আসছে। এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক লক্ষণ, কারণ আদর্শিক ভাঙন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ভাঙনের পথ প্রশস্ত করে।
এই প্রেক্ষাপটে নাগরিকরা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করছে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার দায় কার? কেন প্রশাসন কার্যকর নয়? কেন আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা নেই? কেন সরকার জনগণের সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছে?
ইউনুস সরকারের প্রধান ব্যর্থতা হলো রাষ্ট্র পরিচালনাকে তারা তাত্ত্বিক নৈতিকতার স্তরে সীমাবদ্ধ রেখেছে, কিন্তু বাস্তব শাসনক্ষমতা প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র কেবল ভালো উদ্দেশ্যে চলে না রাষ্ট্র চলে দক্ষতা, সিদ্ধান্ত ও কর্তৃত্ব দিয়ে। এই তিনটিরই ঘাটতি আজ স্পষ্ট।
একটি রাষ্ট্র যখন নাগরিকের আস্থা হারায়, তখন সেটিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট। আজ বাংলাদেশের মানুষ কেবল অসন্তুষ্ট নয়—তারা দিশেহারা। এই দিশেহারাপনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সামাজিক সংঘাত, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং গভীর অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে উঠবে।
এটি কোনো দলীয় বয়ান নয় এটি নাগরিক অভিজ্ঞতার সারাংশ। ইতিহাসে শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে কঠিন মূল্যায়ন আসে তখনই, যখন মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেয়। আজ সেই জায়গাতেই বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এবং এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ আর নেই।

Tag :

কমেন্ট করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

Glorifying War Criminals in an Illegal Parliament During the Month of Independence: A Shameful Chapter in History and an Ultimate Act of National Betrayal

ইউনুস সরকারের অধীনে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের সংকট,উন্নয়ন থেকে অনিশ্চয়তার পথে বাংলাদেশ

Update Time : 07:56:06 pm, Monday, 22 December 2025

নিউজ ডেস্ক :: রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার কাঠামো নয় রাষ্ট্র মূলত নাগরিকের নিরাপত্তা, আস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নিশ্চয়তা। বিগত প্রায় দেড় দশক বাংলাদেশে এই নিশ্চয়তাগুলো—সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটি কার্যকর কাঠামোর মধ্যে ছিল। সাধারণ মানুষের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু তখন রাজনীতি নয়, বরং জীবনযাপন।
মানুষ ব্যস্ত ছিল আয়–রোজগারে, ব্যবসা–বাণিজ্য সম্প্রসারণে, সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার পরিকল্পনায়। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া, পরিবার নিয়ে ভ্রমণ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এসব ছিল স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত বাস্তবতা। সামাজিক জীবনে অস্থিরতা ও অনিরাপত্তার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম ছিল, যা রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক সাফল্যের সূচক।
এই সময়কালে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যান ছিল না, ছিল দৃশ্যমান বাস্তবতা। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিল্পায়ন—দেশের ভেতরেই “সম্ভব”-এর ধারণা তৈরি হয়েছিল। তরুণ সমাজ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, নতুন ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছিল। রাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্ক ভালো না খারাপ—এটি সাধারণ মানুষের নিত্য আলোচনার বিষয় ছিল না, কারণ অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ছিল তুলনামূলকভাবে কার্যকর ও স্থিতিশীল।
এই স্থিতিশীলতার কেন্দ্রে ছিল নেতৃত্বের সক্ষমতা। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি—এসব নিয়ে বড় ধরনের জাতীয় অনিশ্চয়তা তখন দেখা যায়নি। বরং নেতৃত্বের দক্ষতা নিয়ে এক ধরনের গর্ববোধ সমাজে বিদ্যমান ছিল।
কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে। বর্তমান ইউনুস সরকারের অধীনে রাষ্ট্র পরিচালনার যে চিত্র সামনে এসেছে, তা মূলত একটি শাসনশূন্যতার রাজনীতি। এখানে সংকট তৈরি হয়েছে কোনো একটি খাতে নয় বরং প্রায় সব মৌলিক স্তম্ভে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মানুষ আজ ছিনতাই, ডাকাতি, মব সন্ত্রাস, উগ্রবাদী তৎপরতা এবং চরমপন্থার ভয়ে বসবাস করছে। রাষ্ট্র যে নাগরিককে নিরাপত্তা দেবে এই মৌলিক সামাজিক চুক্তি কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয় এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সংকট।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি শোচনীয়। ব্যবসা–বাণিজ্য স্থবির, বিনিয়োগ কমছে, কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে। কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে, তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। উন্নয়ন কার্যক্রম কার্যত থমকে গেছে, অথচ বিকল্প কোনো সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক রূপরেখা দৃশ্যমান নয়। এই অবস্থাকে কেবল বৈশ্বিক চাপ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না এটি মূলত নীতিগত অদক্ষতার ফল।
সবচেয়ে গভীর সংকটটি তৈরি হয়েছে আদর্শিক ক্ষেত্রে। স্বাধীনতাবিরোধী ও উগ্রবাদী শক্তির পুনরুত্থান এখন আর প্রান্তিক নয় তারা ক্রমশ প্রকাশ্য ও সাহসী হচ্ছে। সামাজিক সহনশীলতা ক্ষয়ে যাচ্ছে, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার ওপর আঘাত আসছে। এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক লক্ষণ, কারণ আদর্শিক ভাঙন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ভাঙনের পথ প্রশস্ত করে।
এই প্রেক্ষাপটে নাগরিকরা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করছে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার দায় কার? কেন প্রশাসন কার্যকর নয়? কেন আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা নেই? কেন সরকার জনগণের সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছে?
ইউনুস সরকারের প্রধান ব্যর্থতা হলো রাষ্ট্র পরিচালনাকে তারা তাত্ত্বিক নৈতিকতার স্তরে সীমাবদ্ধ রেখেছে, কিন্তু বাস্তব শাসনক্ষমতা প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র কেবল ভালো উদ্দেশ্যে চলে না রাষ্ট্র চলে দক্ষতা, সিদ্ধান্ত ও কর্তৃত্ব দিয়ে। এই তিনটিরই ঘাটতি আজ স্পষ্ট।
একটি রাষ্ট্র যখন নাগরিকের আস্থা হারায়, তখন সেটিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট। আজ বাংলাদেশের মানুষ কেবল অসন্তুষ্ট নয়—তারা দিশেহারা। এই দিশেহারাপনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সামাজিক সংঘাত, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং গভীর অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে উঠবে।
এটি কোনো দলীয় বয়ান নয় এটি নাগরিক অভিজ্ঞতার সারাংশ। ইতিহাসে শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে কঠিন মূল্যায়ন আসে তখনই, যখন মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেয়। আজ সেই জায়গাতেই বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এবং এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ আর নেই।