কালো ধোঁয়ায় বিষাক্ত ঢাকা, ফিটনেসবিহীন যান আর নীতিগত ব্যর্থতার মূল্য দিচ্ছে নাগরিকরা

ঢাকা ডেস্ক অনলাইন :: রাজধানী ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার কিংবা ব্যস্ত মোড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই চোখে পড়ে এক ভয়াবহ বাস্তবতা—চারপাশ ঘিরে ধরে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। পুরোনো, ফিটনেসবিহীন বাস, মিনিবাস ও ট্রাক থেকে নির্গত এই ধোঁয়া শুধু দৃশ্যমান দূষণ নয় এটি নীরবে ঢাকার বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। প্রতিদিন লাখো মানুষ এই দূষণের শিকার হলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি যেন অধরাই থেকে যাচ্ছে।
ঢাকা শহরে চলাচলকারী বহু বাস ও ট্রাকের ইঞ্জিন ২০ থেকে ২৫ বছরের পুরোনো। এসব লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন ইঞ্জিনের চাপ নিতে না পেরে অবিরাম কালো ধোঁয়া ছাড়ছে। যাত্রী ওঠানামার সময় যেমন, চলার সময়ও একই চিত্র। অথচ বছরের পর বছর ধরে এসব যান অবাধে সড়কে চলাচল করছে—দেখেও যেন দেখার কেউ নেই।
সড়কে ৬ লাখের বেশি অবৈধ যান
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৩ লাখ ৪৪ হাজার। এর মধ্যে অন্তত ৬ লাখ ৬৫ হাজার যানবাহনের নেই হালনাগাদ রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সার্টিফিকেট, রুট পারমিট বা ট্যাক্স টোকেন। অর্থাৎ প্রতিদিন সড়কে চলা বিপুলসংখ্যক যান কার্যত অবৈধ।
এই অবৈধ যানগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২১ হাজার বাস, ১২ হাজার মিনিবাস, সাড়ে ৫৭ হাজার ট্রাক, ৭৩ হাজারের বেশি প্রাইভেটকার এবং ৩১ হাজার মাইক্রোবাস। এসব যান একদিকে সরকারের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে রাষ্ট্রকে, অন্যদিকে বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ।
বায়ুদূষণের বড় উৎস ফিটনেসবিহীন গাড়ি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস ফিটনেসবিহীন যানবাহন। পরিবেশবিদরা বলছেন, যানবাহনের ফিটনেস ঠিক থাকলেও ফসিল ফুয়েল ব্যবহারের কারণে দূষণ পুরোপুরি বন্ধ হয় না; কিন্তু ফিটনেসবিহীন গাড়ি পরিস্থিতিকে বহুগুণ ভয়াবহ করে তোলে। প্রশ্ন উঠছে—বিআরটিএতে গিয়ে কোনো গাড়ি ফিটনেস না পাওয়ার নজির কেন প্রায় নেই?
গবেষণাও একই চিত্র তুলে ধরছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বায়ুদূষণের ১০ দশমিক ৪ শতাংশের উৎস যানবাহন। বাস ও মিনিবাসের ৮৪ শতাংশ, ট্রাকের ৬৯ শতাংশ এবং হালকা যানবাহনের প্রায় ৫৯ শতাংশ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কালো ধোঁয়া ছাড়ছে।
পুরোনো গাড়ির অবাধ চলাচল
ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো চলাচল করছে ২০ ও ২৫ বছরের বেশি পুরোনো প্রায় ৭৩ হাজার যানবাহন। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই রয়েছে হাজার হাজার বাস ও ট্রাক। যদিও ২০২৩ সালে বিআরটিএ এসব গাড়ির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল, বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। কয়েক মাসের মধ্যেই প্রজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করা হয়—অভিযোগ রয়েছে, পরিবহন মালিকদের চাপের মুখে।
অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকার পুরোনো গাড়ি সড়ক থেকে সরানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে ঢাকার সড়কে এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ধোঁয়া ছড়ানো পুরোনো যান।
দায়সারা অভিযান, কাঠামোগত ব্যর্থতা
২০২৪ সালে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে ১০ হাজারের বেশি মামলা ও দুই কোটির বেশি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দালাল গ্রেপ্তার ও কিছু যান ডাম্পিংও হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অভিযান সমস্যার মূল সমাধান নয়—এগুলো মূলত দায়সারা পদক্ষেপ।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহন মালিক ও কর্তৃপক্ষ—উভয় পক্ষই দায় এড়াতে পারে না। বছরের পর বছর ছাড় দিয়ে, ‘ম্যানেজ’ করে গাড়ি চালানোর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। একদিনে তো সাত লাখ অবৈধ গাড়ি সড়কে নামেনি এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতার ফল।
জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি
চিকিৎসকদের মতে, যানবাহনের কালো ধোঁয়া শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক মানুষ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাসের ফলে হৃদরোগ, ফুসফুসজনিত রোগ ও অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাংলাদেশে প্রতিবছর এক লাখের বেশি অকাল মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব—যার বড় অংশ ঢাকার বাসিন্দা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বিআরটিএর স্বচ্ছ ও কাঠামোগত সংস্কার। ফিটনেস সনদকে কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তব ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে পুরোনো ও দূষণকারী যানবাহন পর্যায়ক্রমে সরিয়ে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থায় যেতে হবে।
ঢাকার আকাশ পরিষ্কার করা শুধু পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ নয়—এটি জনস্বাস্থ্য, নাগরিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাঁচার প্রশ্ন। কালো ধোঁয়ায় ঢাকা এই নগরী আর কতদিন নীরবে বিষ গ্রহণ করবে—সে উত্তর এখনই খোঁজা জরুরি।

Tag :

কমেন্ট করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

Glorifying War Criminals in an Illegal Parliament During the Month of Independence: A Shameful Chapter in History and an Ultimate Act of National Betrayal

কালো ধোঁয়ায় বিষাক্ত ঢাকা, ফিটনেসবিহীন যান আর নীতিগত ব্যর্থতার মূল্য দিচ্ছে নাগরিকরা

Update Time : 07:51:51 pm, Tuesday, 23 December 2025

ঢাকা ডেস্ক অনলাইন :: রাজধানী ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার কিংবা ব্যস্ত মোড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই চোখে পড়ে এক ভয়াবহ বাস্তবতা—চারপাশ ঘিরে ধরে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। পুরোনো, ফিটনেসবিহীন বাস, মিনিবাস ও ট্রাক থেকে নির্গত এই ধোঁয়া শুধু দৃশ্যমান দূষণ নয় এটি নীরবে ঢাকার বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। প্রতিদিন লাখো মানুষ এই দূষণের শিকার হলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি যেন অধরাই থেকে যাচ্ছে।
ঢাকা শহরে চলাচলকারী বহু বাস ও ট্রাকের ইঞ্জিন ২০ থেকে ২৫ বছরের পুরোনো। এসব লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন ইঞ্জিনের চাপ নিতে না পেরে অবিরাম কালো ধোঁয়া ছাড়ছে। যাত্রী ওঠানামার সময় যেমন, চলার সময়ও একই চিত্র। অথচ বছরের পর বছর ধরে এসব যান অবাধে সড়কে চলাচল করছে—দেখেও যেন দেখার কেউ নেই।
সড়কে ৬ লাখের বেশি অবৈধ যান
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৩ লাখ ৪৪ হাজার। এর মধ্যে অন্তত ৬ লাখ ৬৫ হাজার যানবাহনের নেই হালনাগাদ রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সার্টিফিকেট, রুট পারমিট বা ট্যাক্স টোকেন। অর্থাৎ প্রতিদিন সড়কে চলা বিপুলসংখ্যক যান কার্যত অবৈধ।
এই অবৈধ যানগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২১ হাজার বাস, ১২ হাজার মিনিবাস, সাড়ে ৫৭ হাজার ট্রাক, ৭৩ হাজারের বেশি প্রাইভেটকার এবং ৩১ হাজার মাইক্রোবাস। এসব যান একদিকে সরকারের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে রাষ্ট্রকে, অন্যদিকে বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ।
বায়ুদূষণের বড় উৎস ফিটনেসবিহীন গাড়ি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস ফিটনেসবিহীন যানবাহন। পরিবেশবিদরা বলছেন, যানবাহনের ফিটনেস ঠিক থাকলেও ফসিল ফুয়েল ব্যবহারের কারণে দূষণ পুরোপুরি বন্ধ হয় না; কিন্তু ফিটনেসবিহীন গাড়ি পরিস্থিতিকে বহুগুণ ভয়াবহ করে তোলে। প্রশ্ন উঠছে—বিআরটিএতে গিয়ে কোনো গাড়ি ফিটনেস না পাওয়ার নজির কেন প্রায় নেই?
গবেষণাও একই চিত্র তুলে ধরছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বায়ুদূষণের ১০ দশমিক ৪ শতাংশের উৎস যানবাহন। বাস ও মিনিবাসের ৮৪ শতাংশ, ট্রাকের ৬৯ শতাংশ এবং হালকা যানবাহনের প্রায় ৫৯ শতাংশ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কালো ধোঁয়া ছাড়ছে।
পুরোনো গাড়ির অবাধ চলাচল
ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো চলাচল করছে ২০ ও ২৫ বছরের বেশি পুরোনো প্রায় ৭৩ হাজার যানবাহন। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই রয়েছে হাজার হাজার বাস ও ট্রাক। যদিও ২০২৩ সালে বিআরটিএ এসব গাড়ির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল, বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। কয়েক মাসের মধ্যেই প্রজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করা হয়—অভিযোগ রয়েছে, পরিবহন মালিকদের চাপের মুখে।
অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকার পুরোনো গাড়ি সড়ক থেকে সরানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে ঢাকার সড়কে এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ধোঁয়া ছড়ানো পুরোনো যান।
দায়সারা অভিযান, কাঠামোগত ব্যর্থতা
২০২৪ সালে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে ১০ হাজারের বেশি মামলা ও দুই কোটির বেশি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দালাল গ্রেপ্তার ও কিছু যান ডাম্পিংও হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অভিযান সমস্যার মূল সমাধান নয়—এগুলো মূলত দায়সারা পদক্ষেপ।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহন মালিক ও কর্তৃপক্ষ—উভয় পক্ষই দায় এড়াতে পারে না। বছরের পর বছর ছাড় দিয়ে, ‘ম্যানেজ’ করে গাড়ি চালানোর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। একদিনে তো সাত লাখ অবৈধ গাড়ি সড়কে নামেনি এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতার ফল।
জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি
চিকিৎসকদের মতে, যানবাহনের কালো ধোঁয়া শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক মানুষ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাসের ফলে হৃদরোগ, ফুসফুসজনিত রোগ ও অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাংলাদেশে প্রতিবছর এক লাখের বেশি অকাল মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব—যার বড় অংশ ঢাকার বাসিন্দা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বিআরটিএর স্বচ্ছ ও কাঠামোগত সংস্কার। ফিটনেস সনদকে কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তব ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে পুরোনো ও দূষণকারী যানবাহন পর্যায়ক্রমে সরিয়ে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থায় যেতে হবে।
ঢাকার আকাশ পরিষ্কার করা শুধু পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ নয়—এটি জনস্বাস্থ্য, নাগরিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাঁচার প্রশ্ন। কালো ধোঁয়ায় ঢাকা এই নগরী আর কতদিন নীরবে বিষ গ্রহণ করবে—সে উত্তর এখনই খোঁজা জরুরি।