জামাত-নির্ভর প্রশাসন,ইউনূস সরকার নিরপেক্ষ নয়

নিউজ ডেস্ক ::অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিরপেক্ষ—এই দাবি যতবার উচ্চারিত হচ্ছে, ততবারই তা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। ভোলায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য— “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো দলের পক্ষে নয়”—রাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করার একটি প্রচেষ্টা হলেও, মাঠপর্যায়ের ঘটনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের আচরণ সেই বক্তব্যকে সমর্থন করছে না।
৫ আগস্টের পর থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে যে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে, তা কাকতালীয় নয়। প্রশাসনিক নিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাষ্ট্রের নীরবতা—সব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। সেই প্রবণতার কেন্দ্রে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব।
অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হওয়ার কথা ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমান আচরণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। একদিকে কিছু রাজনৈতিক কর্মসূচি কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে, অন্যদিকে জামায়াতের জনসভা ও কার্যক্রম তুলনামূলক নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হচ্ছে। সরওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতের জনসভা এবং সেখানে প্রশাসনের ভূমিকা এই দ্বৈত মানদণ্ডের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
আরও উদ্বেগজনক হলো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস ও অবমাননার ঘটনায় রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা। ভাস্কর্য ভাঙচুর, ঐতিহাসিক প্রতীককে লক্ষ্যবস্তু করা—এসবের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান প্রতিরোধ গড়ে না তোলার অর্থ এক ধরনের নীরব সম্মতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি সেখানে আপস মানে রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়কেই দুর্বল করা।
সমালোচকদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি দুর্বল। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই একটি সংগঠিত শক্তি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করছে। মাঠপর্যায়ে সংগঠিত জনবল, কর্মী ও কাঠামোর অভাব পূরণ করা হচ্ছে জামায়াতঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এখানে প্রশ্ন উঠছে—সরকার কি আদৌ সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন, নাকি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির বাস্তবায়ন কাঠামোতে পরিণত হয়েছে? সরকার মুখে নিরপেক্ষতার কথা বললেও, সিদ্ধান্ত ও নীরবতার মধ্য দিয়ে যে পক্ষপাত প্রকাশ পাচ্ছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণ। রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে ব্যবহৃত শব্দচয়ন, বৈঠকের ধরন ও অগ্রাধিকার কাদের দিকে—সেগুলোও নিরপেক্ষতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এখানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে আশ্বস্ত করে না।
সব মিলিয়ে বাস্তবতা হলো—বর্তমান প্রশাসন কার্যত একটি জামাত-নির্ভর ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে, যেখানে নিরপেক্ষতার ভাষ্য থাকলেও বাস্তবে সুবিধা পাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি। এটি শুধু রাজনৈতিক ভারসাম্য নয়, রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তির জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।
অন্তর্বর্তী সরকার যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হতে চায়, তবে বক্তব্য নয়—কর্মে তার প্রমাণ দিতে হবে। প্রশাসনিক নিয়োগে স্বচ্ছতা, আইনশৃঙ্খলায় সমান আচরণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে জিরো টলারেন্স এবং সব রাজনৈতিক শক্তির জন্য সমান সুযোগ—এই চারটি ক্ষেত্রেই স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
নইলে “নিরপেক্ষ সরকার” শব্দযুগলটি কেবল একটি রাজনৈতিক বাক্যই থেকে যাবে, বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো মিল থাকবে না।

Tag :

কমেন্ট করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

Glorifying War Criminals in an Illegal Parliament During the Month of Independence: A Shameful Chapter in History and an Ultimate Act of National Betrayal

জামাত-নির্ভর প্রশাসন,ইউনূস সরকার নিরপেক্ষ নয়

Update Time : 06:14:56 am, Sunday, 28 December 2025

নিউজ ডেস্ক ::অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিরপেক্ষ—এই দাবি যতবার উচ্চারিত হচ্ছে, ততবারই তা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। ভোলায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য— “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো দলের পক্ষে নয়”—রাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করার একটি প্রচেষ্টা হলেও, মাঠপর্যায়ের ঘটনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের আচরণ সেই বক্তব্যকে সমর্থন করছে না।
৫ আগস্টের পর থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে যে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে, তা কাকতালীয় নয়। প্রশাসনিক নিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাষ্ট্রের নীরবতা—সব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। সেই প্রবণতার কেন্দ্রে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব।
অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হওয়ার কথা ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমান আচরণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। একদিকে কিছু রাজনৈতিক কর্মসূচি কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে, অন্যদিকে জামায়াতের জনসভা ও কার্যক্রম তুলনামূলক নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হচ্ছে। সরওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতের জনসভা এবং সেখানে প্রশাসনের ভূমিকা এই দ্বৈত মানদণ্ডের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
আরও উদ্বেগজনক হলো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস ও অবমাননার ঘটনায় রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা। ভাস্কর্য ভাঙচুর, ঐতিহাসিক প্রতীককে লক্ষ্যবস্তু করা—এসবের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান প্রতিরোধ গড়ে না তোলার অর্থ এক ধরনের নীরব সম্মতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি সেখানে আপস মানে রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়কেই দুর্বল করা।
সমালোচকদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি দুর্বল। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই একটি সংগঠিত শক্তি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করছে। মাঠপর্যায়ে সংগঠিত জনবল, কর্মী ও কাঠামোর অভাব পূরণ করা হচ্ছে জামায়াতঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এখানে প্রশ্ন উঠছে—সরকার কি আদৌ সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন, নাকি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির বাস্তবায়ন কাঠামোতে পরিণত হয়েছে? সরকার মুখে নিরপেক্ষতার কথা বললেও, সিদ্ধান্ত ও নীরবতার মধ্য দিয়ে যে পক্ষপাত প্রকাশ পাচ্ছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণ। রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে ব্যবহৃত শব্দচয়ন, বৈঠকের ধরন ও অগ্রাধিকার কাদের দিকে—সেগুলোও নিরপেক্ষতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এখানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে আশ্বস্ত করে না।
সব মিলিয়ে বাস্তবতা হলো—বর্তমান প্রশাসন কার্যত একটি জামাত-নির্ভর ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে, যেখানে নিরপেক্ষতার ভাষ্য থাকলেও বাস্তবে সুবিধা পাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি। এটি শুধু রাজনৈতিক ভারসাম্য নয়, রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তির জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।
অন্তর্বর্তী সরকার যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হতে চায়, তবে বক্তব্য নয়—কর্মে তার প্রমাণ দিতে হবে। প্রশাসনিক নিয়োগে স্বচ্ছতা, আইনশৃঙ্খলায় সমান আচরণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে জিরো টলারেন্স এবং সব রাজনৈতিক শক্তির জন্য সমান সুযোগ—এই চারটি ক্ষেত্রেই স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
নইলে “নিরপেক্ষ সরকার” শব্দযুগলটি কেবল একটি রাজনৈতিক বাক্যই থেকে যাবে, বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো মিল থাকবে না।