দিনপত্র ডেস্ক | বাংলাদেশ
বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট শিল্প বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে। কয়েক মাস আগে নেওয়া এক নীতিগত সিদ্ধান্ত আজ এই খাতকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। গত এপ্রিল মাসে ইউনুস সরকারের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির ওপর কার্যত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ভারতীয় আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো। তবে বাস্তবে সেই সিদ্ধান্তই এখন শিল্পখাতের জন্য মারাত্মক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থলবন্দরে নিষেধাজ্ঞা, সমুদ্রপথে বাড়ছে আমদানি
নিষেধাজ্ঞাটি কেবল স্থলবন্দর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকায় সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি অব্যাহত থাকে। বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দুই বছরে সমুদ্রপথে সুতা আমদানি দেড় গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
দেশীয় উৎপাদনে ধস, গুদামে অবিক্রীত সুতা
ভারতীয় সুতার তুলনায় দেশীয় সুতার দাম বেশি হওয়ায় বাজারে ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই সস্তা আমদানিকৃত পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে দেশের বিভিন্ন স্পিনিং মিলের গুদামে বিপুল পরিমাণ সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এই অবিক্রীত সুতার আর্থিক মূল্য প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
নগদ অর্থের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু মিল শ্রমিকের মজুরি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলসহ দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
বন্ধ হচ্ছে মিল, কর্মহীন হাজারো শ্রমিক
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারে। ইতিমধ্যে অর্ধশতাধিক স্পিনিং মিল সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার খবর মিলছে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন।
বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলিও উৎপাদন কমাতে কিংবা কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে, যা পরিস্থিতির গভীরতাকেই স্পষ্ট করে।
উপেক্ষিত সতর্কবার্তা, বাড়ছে ক্ষতির আশঙ্কা
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নিষেধাজ্ঞা জারির সময়ই শিল্পমহল সরকারকে সতর্ক করেছিল। টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠন তখন জানায়—সমুদ্রপথে আমদানি বন্ধ না রেখে কেবল স্থলবন্দর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করলে তা দীর্ঘমেয়াদে উল্টো ফল বয়ে আনবে। তবে সেই সতর্কতা উপেক্ষিত হওয়ায় পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নীতিগত ভুলের বোঝা বইছে অর্থনীতির প্রধান খাত
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ আসে টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট শিল্প থেকে, আর জিডিপিতেও এই খাতের অবদান দুই অঙ্কের কাছাকাছি। সেই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পই এখন নীতিগত ভুলের বোঝা বইছে।
যদিও শিল্পমহলের একাংশ ভারতের বিরুদ্ধে ডাম্পিংয়ের অভিযোগ তুলছেন, তবে অর্থনীতিবিদদের মতে বাস্তবতা হলো—বাজারের নিয়ম অনুযায়ী ক্রেতারা কম দামের পণ্যই বেছে নেন।
সংকট থেকে উত্তরণে দ্রুত নীতি সংশোধনের তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত নীতি সংশোধন না হলে সংকট আরও গভীর হবে। স্থলবন্দরে সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যে সমস্যার সমাধান চাওয়া হয়েছিল, তা এখন বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পের জন্য এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক জেদ ও অসম্পূর্ণ নীতির ফল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে—এই সংকট তারই বাস্তব উদাহরণ।
শিরোনাম :
স্থলবন্দরে নিষেধাজ্ঞার মাশুল: ৯,০০০ কোটি টাকার ধাক্কায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প
-
সুরজিত, - Update Time : 07:46:19 pm, Thursday, 1 January 2026
- 339 Time View
Tag :
জনপ্রিয়










