বাংলাদেশে অস্ত্রের রাজনীতির হালহকিকত,লুট, নীরবতা ও অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ

দিনপত্র ডেস্ক :: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি এখন আর শুধু ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়—বরং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া অস্ত্রের বিস্তার। জুলাই আগস্টের সহিংসতার পর যে অস্ত্র-রাজনীতির চিত্র ধীরে ধীরে সামনে আসছে, তা একটি গভীর নিরাপত্তা সংকেত।
জুলাই–আগস্টে বিভিন্ন থানায় সংঘটিত অস্ত্র লুটের ঘটনা। সরকারি স্বীকারোক্তি থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কত অস্ত্র লুট হয়েছে, কত উদ্ধার হয়েছে—সে বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। তবে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের দাবি, লুট হওয়া অধিকাংশ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি এবং সেগুলো জামায়াত–শিবির সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের হাতে পৌঁছেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগ অস্বীকার বা যাচাই কোনোটিই রাষ্ট্রীয়ভাবে করা হয়নি, যা সন্দেহ আরও ঘনীভূত করছে।
৫ আগস্ট গণভবন ও সংসদ ভবন এলাকা থেকে SSF-এর অস্ত্র খোয়া যাওয়ার ঘটনা। এটি কোনো সাধারণ লুট নয় এটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংরক্ষিত নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরের ব্যর্থতা। বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, এই অস্ত্রগুলোর একটি অংশ নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর নিয়ন্ত্রণে গেছে। কিন্তু রাষ্ট্র এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, তদন্ত প্রতিবেদন বা গ্রেপ্তার দেখাতে পারেনি। এই নীরবতা প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্র কি জানে না, নাকি জানতে চায় না?
জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় তুরস্ক থেকে অস্ত্র আসার অভিযোগ। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সূত্রে বলা হচ্ছে, আন্দোলনে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আসা এই অস্ত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল মজিবুর রহমান মঞ্জুর কাছে। কীভাবে বিদেশি অস্ত্র প্রবেশ করল, কোন চ্যানেলে, কার অনুমতিতে—এই প্রশ্নগুলো আজও অনুত্তরিত। এখানে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা আর রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট।
ইউনূস সরকার গঠনের পর সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগটি আসে সীমান্ত ও জঙ্গি নেটওয়ার্ক ঘিরে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি—ARSA রুট ব্যবহার করে বড় আকারের অস্ত্র চালান দেশে ঢুকেছে, যার পেছনে মুফতি হারুন ইজহার জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এটি যদি আংশিকও সত্য হয়, তবে তা কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নয়—বাংলাদেশকে সরাসরি একটি আঞ্চলিক জঙ্গি করিডোরে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো এই সব গুরুতর অভিযোগের বিপরীতে ইউনূস সরকার অস্ত্র উদ্ধার, জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভাঙা বা মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ, আন্দোলনকারী ও বিরোধী কণ্ঠের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা ও গ্রেপ্তার। ফলে রাষ্ট্রের শক্তি ব্যয় হচ্ছে সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে মারাত্মক হুমকির বিরুদ্ধে নয়।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি আর রাজনৈতিক নয় এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
যখন রাষ্ট্র অস্ত্রের উৎসে আঘাত হানে না, তখন অস্ত্রই ধীরে ধীরে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
আর সেই শূন্যস্থান সবচেয়ে দ্রুত দখল করে জঙ্গি ও মৌলবাদী শক্তি।
বাংলাদেশ আজ সেই বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

Tag :

কমেন্ট করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

Glorifying War Criminals in an Illegal Parliament During the Month of Independence: A Shameful Chapter in History and an Ultimate Act of National Betrayal

বাংলাদেশে অস্ত্রের রাজনীতির হালহকিকত,লুট, নীরবতা ও অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ

Update Time : 06:42:41 am, Friday, 2 January 2026

দিনপত্র ডেস্ক :: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি এখন আর শুধু ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়—বরং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া অস্ত্রের বিস্তার। জুলাই আগস্টের সহিংসতার পর যে অস্ত্র-রাজনীতির চিত্র ধীরে ধীরে সামনে আসছে, তা একটি গভীর নিরাপত্তা সংকেত।
জুলাই–আগস্টে বিভিন্ন থানায় সংঘটিত অস্ত্র লুটের ঘটনা। সরকারি স্বীকারোক্তি থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কত অস্ত্র লুট হয়েছে, কত উদ্ধার হয়েছে—সে বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। তবে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের দাবি, লুট হওয়া অধিকাংশ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি এবং সেগুলো জামায়াত–শিবির সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের হাতে পৌঁছেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগ অস্বীকার বা যাচাই কোনোটিই রাষ্ট্রীয়ভাবে করা হয়নি, যা সন্দেহ আরও ঘনীভূত করছে।
৫ আগস্ট গণভবন ও সংসদ ভবন এলাকা থেকে SSF-এর অস্ত্র খোয়া যাওয়ার ঘটনা। এটি কোনো সাধারণ লুট নয় এটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংরক্ষিত নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরের ব্যর্থতা। বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, এই অস্ত্রগুলোর একটি অংশ নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর নিয়ন্ত্রণে গেছে। কিন্তু রাষ্ট্র এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, তদন্ত প্রতিবেদন বা গ্রেপ্তার দেখাতে পারেনি। এই নীরবতা প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্র কি জানে না, নাকি জানতে চায় না?
জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় তুরস্ক থেকে অস্ত্র আসার অভিযোগ। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সূত্রে বলা হচ্ছে, আন্দোলনে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আসা এই অস্ত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল মজিবুর রহমান মঞ্জুর কাছে। কীভাবে বিদেশি অস্ত্র প্রবেশ করল, কোন চ্যানেলে, কার অনুমতিতে—এই প্রশ্নগুলো আজও অনুত্তরিত। এখানে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা আর রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট।
ইউনূস সরকার গঠনের পর সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগটি আসে সীমান্ত ও জঙ্গি নেটওয়ার্ক ঘিরে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি—ARSA রুট ব্যবহার করে বড় আকারের অস্ত্র চালান দেশে ঢুকেছে, যার পেছনে মুফতি হারুন ইজহার জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এটি যদি আংশিকও সত্য হয়, তবে তা কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নয়—বাংলাদেশকে সরাসরি একটি আঞ্চলিক জঙ্গি করিডোরে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো এই সব গুরুতর অভিযোগের বিপরীতে ইউনূস সরকার অস্ত্র উদ্ধার, জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভাঙা বা মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ, আন্দোলনকারী ও বিরোধী কণ্ঠের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা ও গ্রেপ্তার। ফলে রাষ্ট্রের শক্তি ব্যয় হচ্ছে সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে মারাত্মক হুমকির বিরুদ্ধে নয়।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি আর রাজনৈতিক নয় এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
যখন রাষ্ট্র অস্ত্রের উৎসে আঘাত হানে না, তখন অস্ত্রই ধীরে ধীরে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
আর সেই শূন্যস্থান সবচেয়ে দ্রুত দখল করে জঙ্গি ও মৌলবাদী শক্তি।
বাংলাদেশ আজ সেই বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।